শরীরে প্রতিস্থাপন করা থাকবে ছোট্ট একটি তারবিহীন যন্ত্র। রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে এটি সক্রিয় হয়ে অতিরিক্ত গ্লুকোজ অপসারণের কাজ করবে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখে গবেষণারত বাঙালি বিজ্ঞানী দেবাশিস মাইতি ও তাঁর সহকর্মীরা এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তবে এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও মানুষের শরীরে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। ফলে আপাতত এটিকে ইনসুলিন বা ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
গবেষকদের তথ্যমতে, ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় যন্ত্রটি ৯০ মিনিটের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। ছয় সপ্তাহ ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা চালানোর পর ইঁদুরগুলোর অতিরিক্ত ওজন কমেছে এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
যেভাবে কাজ করবে যন্ত্রটি
গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যন্ত্রটি ত্বকের নিচে প্রতিস্থাপন করা হবে। এটি স্মার্টফোনের মাধ্যমে গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। রক্তে গ্লুকোজের একটি নির্দিষ্ট সীমা আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকবে। শর্করার মাত্রা সেই সীমা অতিক্রম করলে যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে অতিরিক্ত গ্লুকোজ অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্তে শর্করার মাত্রা নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে এলে যন্ত্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে প্রযুক্তিটির আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। দেবাশিস মাইতি জানিয়েছেন, মানবদেহে যন্ত্রটি প্রতিস্থাপন করে পরীক্ষা চালানোর আগে এর বিভিন্ন কারিগরি দিক আরও নিখুঁত করতে হবে। একই সঙ্গে যন্ত্রটির আকারও ছোট করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিসের বাড়তি চাপ
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫৯ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৯ কোটি মানুষ ভারতে বসবাস করেন।
ডায়াবেটিসে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ, চোখের জটিলতা ও স্নায়ুর ক্ষতির মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে রোগের ধরন ও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ, ইনসুলিন, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক রোগীকে দীর্ঘমেয়াদে এসব চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।
নতুন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হলে ডায়াবেটিস চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। তবে মানুষের ওপর পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যাচাই এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটি প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়।
জি বাংলা ডেস্ক